বাণিজ্যযুদ্ধ আরো তীব্র হচ্ছে

প্রযুক্তি, খনিজ ও দক্ষ জনশক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করছে চীন

উন্নত প্রযুক্তি, খনিজ ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রকৌশলীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করছে বেইজিং।

উন্নত প্রযুক্তি, খনিজ ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রকৌশলীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসে চীনের বাণিজ্য উত্তেজনা উত্তরোত্তর বেড়েছে, যার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছিল নানা কর্মকাণ্ডে। এর মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে আরো তীব্রতা আনতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে উদ্বুদ্ধ করছে।

এফটির প্রতিবেদন অনুসারে, প্রযুক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান এখন দেশের সীমানায় ধরে রাখতে চাইছে চীন। একাধিক শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মন্ত্রণালয়ের নোটিস থেকে জানা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসে চীনা কর্তৃপক্ষ কিছু ক্ষেত্রে প্রকৌশলী এবং সরঞ্জাম দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া কঠিন করে তুলেছে। ব্যাটারি প্রযুক্তি সংরক্ষণে নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রস্তাব করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটি।

এমন একসময় চীন অগ্রসর প্রযুক্তিতে সুরক্ষাবাদী অবস্থান নিয়েছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন এবং বিদ্যুচ্চালিত গাড়িসংক্রান্ত বাণিজ্যে বিরোধ তৈরি করেছে ইউরোপ। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরো বেশি স্থানীয় ও বিদেশী প্রতিষ্ঠান চীন থেকে উৎপাদন কার্যক্রম অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারে।

এ ধরনের পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানির অন্যতম অ্যাপলের প্রধান উৎপাদন অংশীদার ফক্সকন। সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটি ভারতে সাপ্লাই চেইন সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাইওয়ানি মালিকানাধীন ফক্সকনের জন্য ভারতে সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপকদের স্থানান্তর কঠিন করে তুলেছেন চীনা কর্মকর্তারা।

আরেক তাইওয়ানি ইলেকট্রনিকস কোম্পানির ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা চীন থেকে ভারতে কিছু সরঞ্জাম পাঠাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (যেমন ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া) চালান স্বাভাবিক রয়েছে।

এক ভারতীয় কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, চীনের শুল্ক বিভাগের বিলম্বের কারণে দক্ষিণমুখী যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইলেকট্রনিক পণ্য সরবরাহকারীদের বলা হয়েছে যে তারা যেন ভারতে উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলি কার্যক্রম গড়ে না তোলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেকটাই পশ্চিমা প্রযুক্তি স্থানান্তর নিষেধাজ্ঞার মতোই কৌশল অবলম্বন করছে বেইজিং। যদিও আগে নিজেদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধকে অন্যায় বলে সমালোচনা করত দেশটি। চলমান অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে বেশি প্রয়োগ হচ্ছে। কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রকল্পে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই।

প্রতিবেদন অনুসারে, আগে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এখন বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে আরো বিস্তৃত রফতানি নিষেধাজ্ঞা চালু করছে। এ নিষেধাজ্ঞা বিশ্বব্যাপী প্রযোজ্য হবে। চীন থেকে প্রকৌশলী স্থানান্তরে সমস্যায় পড়া এক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন ও দক্ষ কর্মশক্তি চীনের হাতে থাকা অল্প কিছু সুবিধার মধ্যে একটি। তারা সেটা অন্য দেশের কাছে হারাতে চাইবে না।’

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত মাসে লিথিয়াম উত্তোলন এবং উন্নত ব্যাটারি উপকরণ তৈরির প্রযুক্তি রফতানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে জার্মানির মার্সেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আন্তোনিয়া হামাইদি বলেন, ‘চীন একটি বড় রফতানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করছে এবং কী নিয়ন্ত্রণ করবে তা তারা খুব সচেতনভাবে বেছে নিচ্ছে। মূলত বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে চীনকে রাখতে এ কৌশল।’

তিনি আরো জানান, বেইজিং সরবরাহ চেইনের শীর্ষ স্তরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এখানে উপকরণ ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে উৎপাদিত পণ্যকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখেছে।

পরামর্শক সংস্থা ট্রিভিয়াম চায়নার বিশ্লেষক কোরি কম্বস জানান, ‌ব্যাটারি সরবরাহ চেইনে চীনের পদক্ষেপ ‘‌‍নতুন ধরনের রফতানি নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ’।

এ নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হলে ইউরোপে কারখানা রয়েছে এমন চীনা ব্যাটারি কোম্পানিগুলো বিপত্তিতে পড়বে। তারা পুরো সাপ্লাই চেইন বিদেশে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা পাবে। যেমন ক্যাটল গ্রপকে উন্নত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ক্যাথোডের মতো উপাদান চীন থেকে আমদানি করতে হতে পারে। কারণ তারা স্থানীয়ভাবে এটি উৎপাদন বা ক্রয় করতে পারবে না। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের ফলে চীনের সঙ্গে থাকা দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে। শীর্ষ কোরীয় ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এরই মধ্যে চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ব্যাটারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরইউ গ্রুপের প্রধান স্যাম অ্যাডহাম বলেছেন, ‘কোরীয়রা উচ্চমানের চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণের ফলে তারা হয়তো শুধু আগের বছরের প্রযুক্তিই পেতে পারবে। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তি পাবে না।’

লিথিয়াম উত্তোলন প্রযুক্তি রফতানির ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পকে জটিল করে তুলতে পারে। চীনা গ্রুপ ক্যাটল-সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, বলিভিয়ার লবণাক্ত ভূমি থেকে লিথিয়াম উত্তোলনের ১৪০ কোটি ডলারের প্রকল্পে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে তাদের রফতানি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে।

অবশ্য এ উদ্বেগ সম্পর্কে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ফক্সকন ও ক্যাটল।

আরও